ডা. মুখতার আহমদ আনসারী
ডা. আনসারী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সর্বজন পরিচিত নেতা। তার পুরো নাম ডা. মুখতার আহ্মদ আনসারী। তাঁর পূর্বপুরুষেরা সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে বাইরে থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁরা সরকারের সামরিক ও বেসামরিক বিভাগে বিশিষ্ট পদ অধিকার করে এসেছেন। ডা. আনসারী ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার ইউসুফপুর গ্রামে। ডা. আনসারী তাঁদের পরিবারের অন্যান্যদের মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছিলেন। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য নিজাম সরকারের বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে চলে গেলেন। সেখানে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পর্যায়ক্রমে এল. আর. সি. পি, এম. আর. সি. এস; এম.ডি. এবং এম. এস ডিগ্রী লাভ করেন। সর্বশেষ পরীক্ষায় তিনি সর্ব্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছিলেন, তাঁর এই কৃতিত্বের ফলে তাঁকে লণ্ডনের লক্ হাসপাতালের রেজিষ্ট্রার-এর পদে নিয়োগ করা হয়। ভারতীয়দের মধ্যে একমাত্র তিনি এই মর্যাদা লাভ করেছিলেন।
এরপর তিনি চ্যারিংক্রস হাসপাতালে ইংলণ্ডের রাজার অবৈতনিক চিকিৎসক ডা. বয়েড-এর পরিচালনাধীনে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। এই হাসপাতালে ডা. আনসারী শল্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে সারা ইংলণ্ডে বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এই হাসপাতালে ‘আনসারী ওয়ার্ড’ নামে একটি ওয়ার্ড খোলা হয়েছিল।
ডা. আনসারী চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতিলাভ করলেও সেটাই তার প্রধান পরিচয় নয়, আমাদের কাছে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে সুপরিচিত। লণ্ডনে থাকতেই ভারতের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সংস্পর্শে এসে তিনি রাজনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়লেন। এই সময় তিনি পণ্ডিত মতিলাল নেহেরু, হাকিম আজমল খান ও তরুণ জহরলালের সঙ্গে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ হয়ে পড়েন।
ডা. আনসারী ১৯১০ সালে লণ্ডন থেকে দেশে ফিরে এলেন। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ইতিমধ্যেই এতটা ছড়িয়ে পড়েছিলেন যে তিনি দেশে আসার সাথে সাথে তাঁকে লাহোর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের পদ গ্রহণের জন্য আহ্বান করা হয়। কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে স্বাধীনভাবে দিল্লীতে চিকিৎসা ব্যবসা শুরু করলেন। ১৯২২ সালে তিনি সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক আসরে নামলেন। সে সময়ে ইউরোপে বলকান যুদ্ধ চলছিল। এই বছরেই ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধরত আহত তুর্ক সৈন্যদের সেবা-শুশ্রুষার জন্য তিনি ‘আনসারী মেডিকেল মিশন’ পরিচালনা করেছিলেন। একটা কথা উঠতে পারে এই মিশন একমাত্র মুসলমানদের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল এবং বিদেশের মুসলমানদের স্বার্থরক্ষাই ছিল এই মিশনের লক্ষ্য। তাহলেও একথাটা স্মরণ রাখা দরকার এই মিশন পরিচালনার মধ্যে দিয়ে ভারতের জনগণ এইবারই সর্বপ্রথম আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টি প্রসারিত করেছিল।
ভারতের রাজনীতির ক্ষেত্রে এটা একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য সময়। রাজনৈতিক মতামত ও লক্ষ্যের দিক দিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ আর কোনোদিন পরস্পরের এত কাছাকাছি আসেনি। কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের সদস্যরা নিজ নিজ মঞ্চে দাঁড়িয়ে একইরকম ভাষণ দিতেন, একই সুরে কথা বলতেন। এমন অনেক দৃৃষ্টান্ত আছে যেখানে একই লোক একই সঙ্গে কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের সভ্য হিসেবে কাজ করে গেছেন। সে বিষয়ে তাদের কোনোই বাধা পেতে হতো না। এই রকম রাজনীতির পরিস্থিতিতে কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের মধ্যে ১৯১৬ সালের ‘লক্ষ্ণৌ প্যাক্ট’ সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ও পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল। এই চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে ডা. আনসারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু এই চুক্তি আপাত দৃষ্টিতে সদ্ভাবসম্পন্ন এবং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতিসূচক বলে মনে হলেও এর মধ্যে মারাত্মক বিপদের বীজ নিহিত ছিল। কেননা এইবারই ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সর্বপ্রথম পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থাকে মেনে নিল, যার জন্য ভবিষ্যতে তাকে এবং দেশবাসীকে অতি কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে।
ডা. আনসারী ১৯১৮ সালে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments